মাহবুব আহমেদের নিয়মিত কলাম “ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি”

একটি শিশুর প্রসারিত হাত এবং রাষ্ট্রের নীরবতা
ধোঁয়ায় ঢেকে থাকা এক শহর। চারদিকে ভাঙাচোরা সভ্যতার চিহ্ন। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে “লেডি অব জাস্টিস”—কিন্তু তার মাথা নেই। দাঁড়িপাল্লা এখনও হাতে, তলোয়ারও ঝুলছে, অথচ বিচার নেই। সত্য নেই। মানবিকতা নেই।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি শিশু। ছেঁড়া জামা, খালি পা, হাতে পুরোনো টেডি বিয়ার। শিশুটি হাত বাড়িয়েছে—সম্ভবত সাহায্যের জন্য, হয়তো ন্যায়ের জন্য। কিন্তু সে জানে না, যার কাছে সে হাত বাড়িয়েছে, সেই বিচারব্যবস্থাই বহু আগেই মাথা হারিয়েছে।
এই ছবিটি কেবল একটি কার্টুন নয়; এটি আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি।
আজ পৃথিবীর বহু দেশে বিচার বিলম্বিত হয়, নির্যাতিত মানুষ ন্যায়বিচার পায় না, ক্ষমতার কাছে সত্য পরাজিত হয়। যুদ্ধ, ধর্ষণ, গুম, শিশুহত্যা কিংবা দুর্নীতির খবর প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু চাপা পড়ে যায় নতুন কোনো শিরোনামের নিচে। শুধু থেকে যায় কিছু অসহায় মানুষ—আর কিছু প্রশ্ন।
সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো, এই ব্যর্থতার ভার সবচেয়ে বেশি বহন করে শিশুরা।
যে শিশুরা যুদ্ধ বোঝে না, রাজনীতি বোঝে না, আদালতের ভাষা বোঝে না—তারা শুধু ক্ষুধা বোঝে, ভয় বোঝে, হারিয়ে যাওয়া মানুষ বোঝে। তারা অপেক্ষা করে এমন এক পৃথিবীর জন্য যেখানে সত্যিই “ন্যায়বিচার” বলে কিছু থাকবে।
কিন্তু আমরা কেমন পৃথিবী রেখে যাচ্ছি তাদের জন্য?
যেখানে অপরাধীরা প্রভাবশালী হলে বিচার থেমে যায়।
যেখানে ধর্ষণের শিকারকে প্রশ্ন করা হয়, ধর্ষককে নয়।
যেখানে গরিব মানুষের কান্না খবর হয় না।
যেখানে রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান—সবাই কখনও কখনও নীরব দর্শক।
এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।
কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব। একজন শিল্পী যখন একটি মাথাহীন “লেডি অব জাস্টিস” আঁকেন, তখন তিনি কেবল ছবি আঁকেন না; তিনি সমাজের আয়না তুলে ধরেন। আর সেই আয়নায় আমরা দেখতে পাই আমাদের ভাঙা বিবেককে।
তবুও আশার জায়গা আছে।
কারণ সেই শিশুটি এখনও হাত বাড়িয়েছে।
সে এখনও বিশ্বাস করে—কেউ একজন শুনবে। কেউ একজন বদলাবে এই পৃথিবী।
হয়তো সেই “কেউ” আমাদেরই হতে হবে।



এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।