এক লাখ ডলারের ‘বিয়ে’, গ্রিন কার্ডের পর বিচ্ছেদ: নিউইয়র্কে হাজারের বেশি ভুয়া দাম্পত্যের অভিযোগ

ছবি, ব্যাংক হিসাব, ট্যাক্স রিটার্ন—গ্রিন কার্ডের জন্য সাজানো হতো ‘সম্পূর্ণ সংসার’
নিউইয়র্ক থেকে চীন ও ভানুয়াতু: ভুয়া বিয়ের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে অভিযুক্ত ১১
প্রথম দেখা ম্যারেজ লাইসেন্সের দিনে, শেষ অধ্যায় ডিভোর্স: যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড জালিয়াতির অভিযোগ
স্ট্যান্ডফার্স্ট
বিদেশি নাগরিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ ডলার, মার্কিন ‘জীবনসঙ্গীকে’ ৩০ হাজার এবং রিক্রুটারকে পাঁচ হাজার ডলার—ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এভাবেই পরিচালিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ কথিত বিবাহ-জালিয়াতি নেটওয়ার্ক। তবে অভিযোগপত্রে বর্ণিত কোনো অপরাধই এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
মাহবুব আহমেদ। অভিবাসন বিষয়ক তদন্ত প্রতিবেদন
প্রেম নয়, ‘অভিবাসন প্যাকেজ’
বিয়ের আগে পরিচয় প্রয়োজন ছিল না। একই ছাদের নিচে সংসার করাও নয়। প্রয়োজন ছিল একজন বিদেশি গ্রাহক, অর্থের বিনিময়ে বিয়েতে রাজি একজন মার্কিন নাগরিক এবং কাগজে-কলমে একটি বিশ্বাসযোগ্য দাম্পত্যজীবন।
সেই সাজানো সংসারে থাকত বিয়ের অ্যালবাম, যৌথ ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ও ইউটিলিটি বিল, একসঙ্গে দাখিল করা ট্যাক্স রিটার্ন এবং জীবনবিমায় পরস্পরকে সুবিধাভোগী করার নথি। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সামনে কে কী বলবেন, তারও আয়োজন হতো কথিত প্রশিক্ষণ অধিবেশনে।
স্থায়ী গ্রিন কার্ড পাওয়া গেলে—অথবা আবেদন ব্যর্থ হলে—নেটওয়ার্কটি আবার বিচ্ছেদের ব্যবস্থাও করে দিত বলে অভিযোগ।
১২ আগস্ট ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে প্রকাশিত ২১ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে ১১ ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন একটি বিস্তৃত বিবাহ ও অভিবাসন জালিয়াতির ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়ার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
ফেডারেল অভিযোগপত্র অনুযায়ী, অন্তত ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নেটওয়ার্কটি এক হাজারের বেশি কথিত ভুয়া বিয়ের আয়োজন করেছে। বিদেশি গ্রাহকদের অধিকাংশই ছিলেন চীনের নাগরিক। তবে প্রত্যেক বিয়ের পৃথক বিবরণ বা কতজন শেষ পর্যন্ত গ্রিন কার্ড পেয়েছেন, তা অভিযোগপত্রে প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মামলাটিকে দেশটির ইতিহাসে দায়ের হওয়া বৃহত্তম বিবাহ-জালিয়াতি মামলাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অভিযুক্ত ১১ জন
মামলাটি হয়েছে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতে। অভিযুক্তরা হলেন:
ব্রুকলিনের অ্যামি চেং বা ‘অ্যামি ঝৌ’, ৭২
কুইন্সের শিয়াও মেই চ্যান বা ‘কারমেন’, ৬৪
কুইন্সের ক্রিস্টিন লু বা ‘লিলি’, ৫২
স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের জিং ইয়ান ইয়ে বা ‘সেরিন’, ৪৩
ব্রুকলিনের শিয়াও ইয়ান চেন বা ‘আনা’, ৪৮
কুইন্সের গ্যাং ঝেং বা ‘মাইকেল/মাইক’, ৬১
স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের অ্যান্থনি চেং, ৪৭
স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের মিশেল ডুয়েনাস, ৩৫
স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের অ্যাঞ্জেলা ডুয়েনাস, ২৬
পিকস্কিলের সিগ্রিড সেটিনো, ৩২
অসিনিংয়ের এরিকা জনসন, ৪৩
প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কথিত নেটওয়ার্কে একেকজনের ভূমিকা ছিল আলাদা—কেউ বিদেশি গ্রাহক খুঁজতেন, কেউ মার্কিন নাগরিক সংগ্রহ করতেন, কেউ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেন, আর কেউ USCIS-এর আবেদন ও সহায়ক কাগজপত্র প্রস্তুত করতেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সত্য হলো: অভিযোগপত্র কোনো দণ্ডাদেশ নয়। বিচার বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতে যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামিকে নির্দোষ ধরে নিতে হবে।
এক লাখ ডলারের ব্যবসায়িক কাঠামো
অভিযোগপত্রে কথিত লেনদেনের একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।
গ্রিন কার্ডের উদ্দেশ্যে বিয়ে ও আবেদন-সহায়তার জন্য কোনো কোনো বিদেশি নাগরিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় এক লাখ ডলার নেওয়া হতো। বিয়েতে অংশ নেওয়া মার্কিন নাগরিক পেতেন সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ হাজার ডলার। আবার একজন মার্কিন নাগরিক খুঁজে দেওয়ার জন্য রিক্রুটারকে দেওয়া হতো সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার কমিশন।
মার্কিন নাগরিকের অর্থ সাধারণত তিন কিস্তিতে পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে:
বিয়ে ও গ্রিন কার্ডের আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রথম কিস্তি;
দুই বছরের শর্তযুক্ত বা conditional গ্রিন কার্ড পাওয়ার পর সাধারণত ১৫ হাজার ডলার;
শর্ত তুলে স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পাওয়ার পর সাধারণত আরও পাঁচ হাজার ডলার।
প্রথম কিস্তির নির্দিষ্ট পরিমাণ সব ক্ষেত্রে এক ছিল কি না, অভিযোগপত্রে তা স্পষ্ট নয়।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষের অনুমান, নেটওয়ার্কটির আকার ও কার্যক্রমের সময়কাল বিবেচনায় বিদেশি গ্রাহকদের কাছ থেকে কয়েক কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি সরকারি অনুমান—আদালতে যাচাই করা কোনো চূড়ান্ত আর্থিক হিসাব নয়।
প্রথম দেখা, তারপর বিয়ের অভিনয়
প্রসিকিউটরদের বর্ণনায় সবচেয়ে নাটকীয় বিষয় হলো, অনেক কথিত দম্পতির প্রথম পরিচয় হতো নিউইয়র্ক সিটি ক্লার্কের অফিসের কাছে—ম্যারেজ লাইসেন্স নেওয়ার ঠিক আগে।
লাইসেন্স পাওয়ার পর কখনো একই দিনেই বিয়ের অনুষ্ঠান করা হতো। নিকটবর্তী রেস্তোরাঁয় গিয়ে বর-কনে চীনা ঐতিহ্যবাহী বিয়ের পোশাক পরতেন। বন্ধু, স্বজন কিংবা নেটওয়ার্কের সদস্যদের নিয়ে ছবি তোলা হতো, যেন অনুষ্ঠানটি একটি প্রকৃত পারিবারিক বিয়ে।
অভিযোগপত্রে এমন বিয়ের একাধিক ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিচার বিভাগের প্রকাশিত ছবিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুখ গোপন রাখা হয়েছে।
কিছু কথিত দম্পতিকে বিয়ের দিন বা পরে নেটওয়ার্ক-সংশ্লিষ্ট অফিসে নিয়ে USCIS-এর কাগজপত্রে স্বাক্ষর করানো হতো। একই সঙ্গে তারা এমন প্রাক্-বিবাহ চুক্তি করতেন বলে অভিযোগ, যেখানে উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ, বৈবাহিক সম্পত্তি এবং সন্তান-সহায়তা সংক্রান্ত অধিকার পরিত্যাগের শর্ত থাকত।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা একটি চুক্তির বক্তব্যের সারকথা ছিল—স্বামী-স্ত্রী পরিচয় ছাড়া দুই পক্ষ স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করবেন এবং পরস্পরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন না।
কাগজে তৈরি ‘সংসার’
আইনগত বিয়ে হওয়া এবং অভিবাসনের দৃষ্টিতে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক এক বিষয় নয়। কোনো বিয়ে অঙ্গরাজ্যের আইনে বৈধভাবে নিবন্ধিত হলেও শুধু অভিবাসন আইন এড়িয়ে সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হলে সেটি ফেডারেল অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
USCIS প্রকৃত বা bona fide বিয়ের প্রমাণ হিসেবে যৌথ সম্পত্তির মালিকানা, একই বাসস্থানের নথি, যৌথ আর্থিক দায়, সন্তানের জন্মসনদ কিংবা সম্পর্কের বাস্তবতা নির্দেশ করে এমন অন্যান্য প্রমাণ বিবেচনা করতে পারে।
ঠিক এই কাঠামোকেই অভিযুক্ত নেটওয়ার্কটি নকল করেছিল বলে প্রসিকিউটরদের দাবি।
কথিত দম্পতিদের দিয়ে তৈরি করানো হতো:
যৌথ ব্যাংক হিসাব;
যৌথ ইউটিলিটি ও মোবাইল ফোন অ্যাকাউন্ট;
যৌথ ট্যাক্স রিটার্ন;
বিয়ের দিন ও পরবর্তী সময়ের ছবি;
জীবনবিমা, যেখানে একজন অন্যজনের beneficiary বা সুবিধাভোগী;
আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার নথি।
এসব প্রমাণ পরে USCIS-এর কাছে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্কের নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হতো বলে অভিযোগ।
ইমিগ্রেশন সাক্ষাৎকারের জন্য মহড়া
নথিপত্রের পর ছিল মৌখিক অভিনয়ের প্রস্তুতি।
অভিযোগ অনুযায়ী, USCIS-এর সাক্ষাৎকারের আগে কথিত দম্পতিদের নিয়ে প্রশিক্ষণ অধিবেশন হতো। কর্মকর্তারা কী প্রশ্ন করতে পারেন এবং কোন প্রশ্নের কী উত্তর দিতে হবে, তা শেখানো হতো। উদ্দেশ্য ছিল সম্পর্কের প্রকৃত চরিত্র গোপন রাখা এবং দুজনের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য এড়ানো।
অভিযোগপত্র বলছে, এভাবে নিউইয়র্ক ও ব্রুকলিনের USCIS ফিল্ড অফিসে শত শত সন্দেহজনক গ্রিন কার্ড আবেদন ও সহায়ক নথি জমা দেওয়া হয়েছে।
ড্রাইভিং স্কুলের ভেতরে ‘অপারেশনাল হাব’
নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ব্রুকলিনের সানসেট পার্কের একটি ড্রাইভিং স্কুলের ভেতরের অফিস।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, জিং ইয়ান ইয়ে ওই অফিস থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান সমন্বয়, USCIS-এর আবেদন প্রস্তুত, সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও বিভিন্ন সেবাদাতার মধ্যে যোগাযোগ এবং সাক্ষাৎকার-প্রস্তুতির কাজ পরিচালনা করতেন।
গ্রেপ্তারের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সানসেট পার্ক এবং কুইন্সের ফ্লাশিংসহ নিউইয়র্কের একাধিক স্থানে তল্লাশি চালায়।
তদন্তে যুক্ত রয়েছে Homeland Security Investigations, FBI Safe Streets Task Force, USCIS Fraud Detection and National Security Directorate, U.S. Army Criminal Investigation Division এবং Westchester County District Attorney’s Office।
নিউইয়র্ক ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিস্তার
নেটওয়ার্কটির কেন্দ্র নিউইয়র্ক হলেও কথিত কার্যক্রম ছড়িয়ে ছিল কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, পেনসিলভেনিয়া, কেনটাকি, টেনেসি, জর্জিয়া ও ফ্লোরিডায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতেও বিয়ে আয়োজনের অভিযোগ রয়েছে।
শুধু কানেকটিকাটে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত প্রায় ১০০টি এমন বিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। পরে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সেখানে আরও কয়েক ডজন বিয়ে আয়োজনের পৃথক অভিযোগ রয়েছে।
মার্কিন সেনাসদস্যদের নিয়োগের অভিযোগ
মামলার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক অংশটি কেনটাকির একটি মার্কিন সেনাঘাঁটিকে ঘিরে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে সেখানে কর্মরত অন্তত ১৪ জন সক্রিয় সেনাসদস্যকে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে ভুয়া বিয়ের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল। ওই বিদেশিদের মধ্যে আনুমানিক ১১ জন ছিলেন চীনের নাগরিক।
অর্থাৎ, ১৪ সেনাসদস্যের সবাই চীনা নাগরিককে বিয়ে করেছিলেন—এমনটি অভিযোগপত্র বলছে না। প্রকাশিত কয়েকটি বাংলা প্রতিবেদনে এই পার্থক্যটি অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
কিছু সেনাসদস্য নিউইয়র্কে গিয়ে বিয়েতে অংশ নিয়েছিলেন এবং নেটওয়ার্কের সদস্যরা কেনটাকি ও টেনেসিতে গিয়ে অন্তত দুটি কথিত বিয়ে সম্পন্ন করতে সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ।
এই অভিযোগের কারণেই U.S. Army Criminal Investigation Division তদন্তে যুক্ত হয়েছে। তবে অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট সেনাসদস্যদের নাম, তাদের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ বা সামরিক শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করা হয়নি।
বিয়ে শেষ, এবার ডিভোর্স
বিয়ের মাধ্যমে গ্রিন কার্ডের ক্ষেত্রে দাম্পত্য সম্পর্ক দুই বছরের কম পুরোনো হলে সাধারণত বিদেশি জীবনসঙ্গী দুই বছরের conditional permanent residence পান। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণত Form I-751 জমা দিয়ে শর্ত অপসারণের আবেদন করতে হয়। তখনও বিয়েটি প্রকৃত ছিল—এটি প্রমাণের প্রয়োজন হতে পারে।
এই দুই ধাপের কাঠামোই কথিত অর্থ পরিশোধের সময়সূচিতে প্রতিফলিত হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশি গ্রাহক স্থায়ী গ্রিন কার্ড পেলে—অথবা তার আবেদন প্রত্যাখ্যাত বা প্রত্যাহার করা হলে—একই নেটওয়ার্ক সংশ্লিষ্ট দম্পতিকে ডিভোর্স নিতেও সহায়তা করত।
তবে এখানে একটি আইনি সূক্ষ্মতা রয়েছে: বিবাহবিচ্ছেদ নিজে অভিবাসন জালিয়াতির প্রমাণ নয়। প্রকৃত বিয়েও ভেঙে যেতে পারে। আদালতে প্রসিকিউশনকে প্রমাণ করতে হবে যে বিয়ের শুরুতেই উদ্দেশ্য ছিল অভিবাসন আইন ফাঁকি দেওয়া।
আইনটি কেন এমন
কংগ্রেস ১৯৮৬ সালে Immigration Marriage Fraud Amendments বা IMFA প্রণয়ন করে। এর লক্ষ্য ছিল বিয়ের মাধ্যমে অভিবাসন সুবিধা নেওয়ার জালিয়াতি ঠেকানো। বিয়ের বয়স দুই বছরের কম হলে স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদায় দুই বছরের শর্ত আরোপ সেই আইনি ব্যবস্থারই অংশ।
বিবাহ-জালিয়াতির মূল প্রশ্ন কেবল বিয়ের সনদ বৈধ কি না—তা নয়। প্রশ্ন হলো, দুই ব্যক্তি কি সত্যিকার বৈবাহিক জীবন গড়ার উদ্দেশ্যে বিয়ে করেছিলেন, নাকি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অভিবাসন আইন এড়িয়ে যাওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে জেনেশুনে অভিবাসন আইন ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিয়ে করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। বর্তমান মামলায় প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে দুটি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে:
বিবাহ ও অভিবাসন নথি জালিয়াতির ষড়যন্ত্র—দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর;
বিদেশি নাগরিকের বেআইনি বসবাসে উৎসাহ বা সহায়তার ষড়যন্ত্র—দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর।
সম্ভাব্য সাজা যোগ করে প্রত্যেকের নিশ্চিত ১৫ বছর কারাদণ্ড হবে—এমন নয়। দোষী সাব্যস্ত হলে বিচারক প্রযোজ্য আইন, অপরাধের মাত্রা, অভিযুক্তের ভূমিকা এবং ফেডারেল sentencing guidelines বিবেচনা করে সাজা নির্ধারণ করবেন।
জালিয়াতি ঠেকানো বনাম বৈধ দম্পতির অধিকার
মামলাটি অভিবাসন ব্যবস্থার একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব সামনে আনে। সরকারকে প্রতারণা শনাক্ত করতে হবে; কিন্তু একই সঙ্গে আন্তঃদেশীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক প্রকৃত দম্পতিদের অযথা সন্দেহ, বিলম্ব বা হয়রানি থেকে রক্ষা করাও জরুরি।
মার্কিন Government Accountability Office বা GAO ২০২২ সালে জানায়, USCIS-এর Fraud Detection and National Security Directorate প্রতিবছর হাজার হাজার প্রশাসনিক তদন্ত সম্পন্ন করে। তবে সংস্থাটির জনবল নির্ধারণ, তথ্যের সামঞ্জস্য এবং জালিয়াতি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়নে ঘাটতি ছিল। ২০২৬ সালের এক পর্যালোচনাতেও GAO বলেছে, তাদের আগের কিছু সুপারিশ বাস্তবায়িত হলেও কিছু এখনো বাকি।
এ ধরনের বড় মামলা আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখায়। কিন্তু অভিযোগে অধিকাংশ গ্রাহক চীনা নাগরিক হওয়ায় গোটা চীনা অভিবাসী জনগোষ্ঠী কিংবা আন্তঃজাতিগত বিয়েকে সন্দেহের চোখে দেখা ন্যায়সংগত নয়। অপরাধের দায় ব্যক্তিনির্ভর; জাতীয়তা তার বিকল্প প্রমাণ হতে পারে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও প্রয়োজন: মামলাটি মূলত স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা বা গ্রিন কার্ড নিয়ে। গ্রিন কার্ড এবং মার্কিন নাগরিকত্ব একই বিষয় নয়। গ্রিন কার্ড পাওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়া নয়।
যা জানা গেছে
১১ জনের বিরুদ্ধে দুই অভিযোগে ফেডারেল মামলা হয়েছে।
অভিযোগপত্রটি নিউইয়র্কের Southern District-এ প্রকাশ করা হয়।
কথিত কার্যক্রমের সময়কাল অন্তত ২০১৬ থেকে জুলাই ২০২৬।
এক হাজারের বেশি ভুয়া বিয়ে আয়োজনের অভিযোগ রয়েছে।
বিদেশি গ্রাহকদের অধিকাংশ চীনের নাগরিক বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
কোনো কোনো গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় এক লাখ ডলার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মার্কিন নাগরিককে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ হাজার এবং রিক্রুটারকে সর্বোচ্চ প্রায় পাঁচ হাজার ডলার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
১৪ সক্রিয় মার্কিন সেনাসদস্যকে নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে; সংশ্লিষ্ট বিদেশিদের মধ্যে আনুমানিক ১১ জন চীনা নাগরিক।
শত শত সন্দেহজনক গ্রিন কার্ড আবেদন জমা পড়েছে বলে প্রসিকিউটরদের দাবি।
যা এখনো অস্পষ্ট
অভিযুক্তরা আদালতে কীভাবে নিজেদের নির্দোষ দাবি করবেন বা তাদের আইনজীবীদের বিস্তারিত বক্তব্য কী।
কথিত এক হাজারের বেশি বিয়ের মধ্যে কতটি গ্রিন কার্ড অনুমোদিত হয়েছিল।
প্রত্যেক অভিযুক্তের মাধ্যমে ঠিক কতটি বিয়ে ও কত অর্থ লেনদেন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিদেশি গ্রাহক ও মার্কিন নাগরিকদের কতজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা হবে।
অভিযুক্ত সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।
সরকারের ‘কয়েক কোটি ডলার’ হিসাবের পূর্ণ আর্থিক ভিত্তি।
কতজন গ্রিন কার্ডধারীর মর্যাদা পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র ও যাচাই নোট
প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ১২ আগস্টের বিজ্ঞপ্তি, নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে দাখিল করা ২১ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র, USCIS-এর নীতিমালা, GAO-এর জালিয়াতি-ঝুঁকি পর্যালোচনা এবং Reuters, AP ও CBS News-এর স্বাধীন প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। পাঠকের দেওয়া বাংলা প্রতিবেদনগুলো বিষয় শনাক্ত ও তুলনামূলক যাচাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। সব অপরাধমূলক বিবরণ অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত; কোনো আসামি এখনো দোষী সাব্যস্ত হননি।
প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র
#GreenCardFraud #MarriageFraud #NewYork #USCIS #ImmigrationNews #ShamMarriage #NYCLife #CaliforniaChithi




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।