৯০ কোটি টাকার দেনা থেকে নতুন শুরু: অমিতাভ বচ্চনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

আমার প্রিয় মানুষদের একজনকে নিয়ে এই লেখাটা শুরু করছি। তিনি আর কেউ নন একজন সত্যিকারের কিংবদন্তি অমিতাভ বচ্চন। আমি তাকে অন্য কোনো বিশেষণে পরিচিত করার সাহস দেখাচ্ছি না। কয়েকদিন আগে তার জন্মদিন গেলো। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম এই লেখাটির নিয়ে অন্য এক অমিতাভ বচ্চনকে সামনে নিয়ে আসবো। তার জীবনে কঠিন সময়ে অমিতাভ বচ্চনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
একসময় তাঁর বাড়ির সম্পত্তি জব্দের ঝুঁকিতে, পাওনাদারদের চাপ এবং কয়েক ডজন আইনি মামলার কথা নিজেই বলেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। তাঁর গল্প শুধু অধ্যবসায়ের নয়—ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের দায় নেওয়া, নতুন কাজকে মর্যাদা দেওয়া এবং পরিচিত সাফল্যের বাইরে পা বাড়ানোরও।
অমিতাভ বচ্চনকে দেখলে অনেকের মনে হতে পারে—এত বড় তারকার জীবনে সংকট আবার কী? কিন্তু তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের এক অধ্যায়ে ছিল চলচ্চিত্রের কাজ কমে যাওয়া, ব্যবসায়িক উদ্যোগের বিপর্যয়, ঋণের চাপ এবং বাড়ি হারানোর আশঙ্কা। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেছেন, তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব প্রায় শূন্যে নেমেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৫৫টি আইনি মামলা ছিল এবং প্রতিদিন পাওনাদারেরা বাড়িতে আসতেন।
এই সংখ্যাগুলো তাঁর নিজের স্মৃতিচারণ থেকে এসেছে; এগুলোকে আলাদা করে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ভাবা ঠিক হবে না। তবে সংকটের যে পটভূমি—অমিতাভ বচ্চনের কোম্পানি ABCL-এর বড় লোকসান, দেনা এবং তার জেরে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর চাপ—তা ১৯৯৯ সালের সংবাদ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল।
তারকার নাম, করপোরেট স্বপ্ন
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি অমিতাভ বচ্চন অভিনয়ের বাইরে বিনোদনশিল্পে বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা করেন। ABCL—Amitabh Bachchan Corporation Limited—চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পরিবেশনা, টেলিভিশন, সংগীত, প্রতিভা ব্যবস্থাপনা এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো নানা খাতে কাজ করতে চেয়েছিল। ২০১০ সালে বিজনেস টুডে জানায়, ১৯৯৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা কোম্পানির লক্ষ্য ছিল ২০০০ সালের মধ্যে এক হাজার কোটি রুপির বিনোদন ও চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠা।
স্বপ্নের আকার ছিল বড়; কিন্তু দ্রুত একাধিক খাতে সম্প্রসারণ, কিছু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত এবং কয়েকটি চলচ্চিত্রের ব্যর্থতা কোম্পানিকে চাপে ফেলে। ১৯৯৯ সালের সমসাময়িক রেডিফ প্রতিবেদনে ABCL-এর নানা উদ্যোগের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও আর্থিক বিপর্যয়ের সমালোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে ১৯৯৬ সালের মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রসঙ্গও ছিল: ওই অনুষ্ঠানেই কোম্পানির বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিজনেস টুডে-র পরবর্তী হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে ABCL-এর ক্ষতি দাঁড়িয়েছিল ৭০.৮২ কোটি রুপি এবং ঋণ ছিল প্রায় ৭০ কোটি রুপি। আর অমিতাভ পরে এক সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত গ্যারান্টির কারণে তাঁর নিজের ওপর প্রায় ৯০ কোটি রুপি পরিশোধের দায় আসার কথা বলেন। এই দুই অঙ্ক এক নয়: প্রথমটি কোম্পানির হিসাব হিসেবে প্রতিবেদনে এসেছে; দ্বিতীয়টি তাঁর নিজের বর্ণনায় ব্যক্তিগত দায়ের পরিমাণ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। পরিচিতি ব্যবসায় সুযোগ এনে দিতে পারে, কিন্তু বড় নাম নিজে থেকে ভালো ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি যাচাই বা আর্থিক শৃঙ্খলার বিকল্প নয়। অমিতাভের সাফল্য তাঁকে ব্যর্থতার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করেনি; বরং ব্যক্তিগত গ্যারান্টির কারণে ব্যবসার ক্ষতি তাঁর নিজের জীবনে সরাসরি এসে পড়েছিল।
দরজায় পাওনাদার, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিরাট পর্দায় যাঁকে দর্শক শক্তিমান চরিত্রে দেখেছেন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ওই সময়টি ছিল অপমান ও অনিশ্চয়তার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ উদ্ধৃত পুরোনো সাক্ষাৎকারে অমিতাভ বলেন, তাঁর সম্পত্তি জব্দের আওতায় এসেছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক সংস্থা ও ব্যক্তিগত ঋণ—বিভিন্ন উৎসের দেনা ছিল; জয়া বচ্চনসহ ব্যক্তিগত গ্যারান্টিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছিল। পাওনাদারদের প্রতিদিন বাড়িতে আসাকে তিনি “বিব্রতকর” ও “অপমানজনক” বলে স্মরণ করেন।
তিনি তখন কেবল ব্যবসায় ক্ষতির মুখে ছিলেন না। ২০১০ সালে নিজের ব্লগে ২০০০ সালের আগের অবস্থা স্মরণ করে লিখেছিলেন—চলচ্চিত্রের কাজ ছিল না, অর্থ ছিল না, কোম্পানিও ছিল না; কর কর্তৃপক্ষ তাঁর বাড়ির বিরুদ্ধে আদায়ের নোটিশ দিয়েছিল। এটি তাঁর নিজের ভাষ্য, সংবাদমাধ্যমের বানানো নাটকীয় সংলাপ নয়।
তবে সংকটের গল্প বলার সময় একটা সীমা মনে রাখা দরকার। অমিতাভের অভিজ্ঞতা অনুপ্রেরণার, কিন্তু প্রত্যেকের জন্য একই পথ খোলা থাকে না। তাঁর খ্যাতি, চলচ্চিত্রজগতের পরিচিতি এবং কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা তাঁর প্রত্যাবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল। তাই তাঁর গল্পকে “শুধু ইচ্ছাশক্তি থাকলেই সবাই একইভাবে উঠে দাঁড়াতে পারে”—এমন সরল সূত্রে নামিয়ে আনা ন্যায্য হবে না।
ছোট পর্দায় বড় সিদ্ধান্ত
সংকটের মধ্যেই অমিতাভের সামনে আসে কৌন বনেগা ক্রোড়পতি—KBC। তখন চলচ্চিত্র তারকার জন্য টেলিভিশনে উপস্থাপনার কাজ নেওয়া ছিল সহজ বা নিশ্চিতভাবে লাভজনক সিদ্ধান্ত নয়। ২০২৬ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত নির্মাতা তরুণ কাতিয়ালের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, অমিতাভ শুরুতে প্রস্তাবটি নিতে আগ্রহী ছিলেন না; তাঁকে রাজি করাতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। প্রথম পর্বের আগে তিনি মাসের পর মাস নিয়মিত মহড়াও দিয়েছিলেন।
২০০০ সালে প্রচার শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি শুধু তাঁর কর্মজীবনে নতুন দরজা খোলেনি; ভারতীয় টেলিভিশনের দর্শক-সংস্কৃতিতেও বড় ঘটনা হয়ে ওঠে। একাডেমিক জার্নাল Flow-তে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়, প্রথম মৌসুমে KBC-র রেটিং ছিল প্রায় ১৪ TVR—সে সময়ের অনেক কেবল অনুষ্ঠানের এক অঙ্কের রেটিংয়ের তুলনায় যা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশ্লেষক শিব বিশ্বনাথনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে লেখাটি দেখায়, প্রতিযোগীদের সঙ্গে অমিতাভের মানবিক ও ব্যক্তিগত সংযোগ অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
অমিতাভ নিজেও ২০১০ সালে বলেছিলেন, টেলিভিশনের প্রস্তাব তাঁর জীবনের হিসাব বদলে দেয়। KBC জনপ্রিয় হওয়ার পর তিনি আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসেন এবং চ্যানেলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেন। একই সময়ে যশ চোপড়ার মোহাব্বতে ছবিতে তাঁর অভিনয় বড় পর্দায় প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দেয়। ফলে ঘুরে দাঁড়ানোর কৃতিত্বকে একটি অনুষ্ঠান বা একটি ছবির একক ফল বলা ঠিক হবে না: টেলিভিশনের কাজ, চলচ্চিত্রে ফিরে আসা এবং বিজ্ঞাপনের সুযোগ—সব মিলিয়ে নতুন আয়ের পথ তৈরি হয়েছিল।
বিজনেস টুডে ২০১০ সালে লিখেছিল, KBC এবং পরবর্তী বিজ্ঞাপনচুক্তি পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধে সহায়তা করেছিল। পত্রিকাটি প্রথম দিকের KBC-তে তাঁর পারিশ্রমিকের যে হিসাব দিয়েছিল, সেটি ছিল সংবাদমাধ্যমের অনুমান—প্রকাশিত নিরীক্ষিত চুক্তিপত্র নয়। তাই তা নিশ্চিত আয়ের পরিমাণ হিসেবে উদ্ধৃত করা উচিত নয়।
প্রত্যাবর্তনের মানে শুধু অর্থ ফেরত পাওয়া নয়
অমিতাভের গল্পে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বাঁকটি হয়তো তাঁর টেলিভিশনে আসা। তিনি এমন একটি কাজ গ্রহণ করেছিলেন, যা তাঁর পরিচিত “বড় পর্দার নায়ক” পরিচয়ের বাইরে ছিল। নতুন মাধ্যমকে ছোট করে না দেখে, তার নিজস্ব ছন্দ ও দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। KBC-তে প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন তাকে কেবল অভিনেতা নয়, ঘরের বসার ঘরে পরিচিত এক সঞ্চালক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করে।
তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত তিনটি কথা স্পষ্ট। প্রথমত, খ্যাতি আর আর্থিক নিরাপত্তা এক জিনিস নয়। দ্বিতীয়ত, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মধ্যে নিজের ভুল সিদ্ধান্তের দায় স্বীকার করাও আছে। তৃতীয়ত, প্রত্যাবর্তন মানে আগের অবস্থায় হুবহু ফিরে যাওয়া নয়—কখনো নতুন কাজ, নতুন দক্ষতা, নতুন দর্শক এবং নতুন পরিচয় তৈরি করা।
তবু এই গল্প উদ্যোক্তাদের জন্য অন্ধ সাহসের উপদেশ নয়। ABCL-এর বিপর্যয় দেখায়, বড় লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত সম্প্রসারণ ও দুর্বল ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে। ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দেওয়ার আগে তার পরিণতি বোঝা, ব্যবসায় পেশাদার ব্যবস্থাপনা রাখা এবং প্রতিটি উদ্যোগের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। অমিতাভের প্রত্যাবর্তন অনুপ্রেরণা দেয়; তাঁর ব্যবসায়িক বিপর্যয় সতর্কও করে।
২০২৬ সালের M3M Hurun India Rich List-এ অমিতাভ বচ্চন ও তাঁর পরিবারের সম্পদের আনুমানিক মূল্য ৪,০০০ কোটি রুপি বলা হয়েছে। এটি ধনী ব্যক্তিদের তালিকার একটি অনুমান—ব্যক্তিগত সম্পদের নিরীক্ষিত হিসাব নয়। সংখ্যাটি তাঁর আজকের অবস্থান বোঝাতে পারে, কিন্তু তাঁর জীবনের মূল্য শুধু বর্তমান সম্পদে মাপা যায় না। আসল গল্পটি হলো, একসময় কাজ ও অর্থ—দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়ার পর তিনি নতুন কাজকে গ্রহণ করেছিলেন, প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং বহু বছর ধরে পর্দায় ও পর্দার বাইরে নিজের স্থান আবার গড়েছেন। এই জীবন্ত কিংবদন্তিকে আজকের আয়োজন শেষ করছি। অন্য কোনো দিন তাকে নিয়ে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে লিখবো তাতে কেনো সন্দেহ নেই কারন তিনি হচ্ছেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
মাহবুব আহমেদ | বাংলাদেশি-আমেরিকান উদ্যোক্তা|লেখক|সম্পাদক ও নাগরিক অধিকারকর্মী।
#অমিতাভবচ্চন #জীবনসংগ্রাম #KBC #ABCL #ঘুরেদাঁড়ানো #Bollywood #অনুপ্রেরণা
প্রধান সূত্রের সরাসরি লিংক




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।