বইয়ের গায়ে তালা, ইতিহাসের দরজায় হাত

অজ্ঞতা ও স্বাধীনতা নিয়ে — থমাস জেফারসন, চার্লস ইয়ান্সিকে লেখা চিঠি, ১৮১৬ চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের কলাম লেখা শুরু করছি।
“If a nation expects to be ignorant and free, in a state of civilization, it expects what never was and never will be.”
ভাবানুবাদ: “কোনো জাতি যদি সভ্য অবস্থায় অজ্ঞ থেকেও স্বাধীন থাকতে চায়, তবে সে এমন কিছুর আশা করে—যা কখনো ছিল না, কখনো হবেও না।”
বইয়ের দোকানে তালা ঝুললে শুধু একটি দোকান বন্ধ হয় না। বন্ধ হয়ে যায় পাঠকের হাতে পৌঁছানোর একটি পথও। ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বিক্রয়কেন্দ্রে অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রি নিয়ে আপত্তি ওঠে। বইটি নিষিদ্ধ—এমন দাবি করে কয়েকজন শাটার নামিয়ে তালা দেন বলে প্রকাশক ও সংবাদমাধ্যমের বর্ণনা। দুই কর্মীকে ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়; তাঁদের মুক্তির সময় বইটি আর বিক্রি না করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল বলে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান। পরে ফাঁড়ির ইনচার্জ বলেন, বিক্রয়কেন্দ্রটি খুলে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিবরণে ফারাক আছে। পুলিশ কর্মকর্তার এক বক্তব্যে কর্মীদের মুক্তির শর্তের কথা এসেছে। আবার লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার বলেছেন, পুলিশ দোকানে তালা দেয়নি; এক ব্যক্তি তালা দিয়েছিলেন। কোনো অভিযোগও জমা পড়েনি বলে তিনি জানান। প্রকাশক ইউপিএল বলেছে, বইটি নিষিদ্ধ—এমন কোনো সরকারি বা আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের জানা নেই। এই অসামঞ্জস্যগুলোই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জরুরি করে তোলে।
এই ঘটনাকে আমি একটি বইয়ের বিক্রি ঘিরে সাময়িক গোলমাল বলে পাশ কাটাতে পারি না। মুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিসর সংকুচিত করা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ বা ছেঁটে দেখানোর যে রাজনৈতিক প্রবণতা—এই ঘটনা তারই এক সতর্কসংকেত। কারা এই চাপ তৈরি করেছে, কী উদ্দেশ্যে করেছে, কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা ছিল কি না—তা এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু পরিকল্পনার প্রমাণ না থাকলেও, বই থামানোর এই চেষ্টা যে পাঠকের স্বাধীনতা ও প্রকাশনার নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
ইতিহাস মুছে ফেলার কাজ সব সময় ইতিহাসের বই পুড়িয়ে শুরু হয় না। কখনো শুরু হয় বইটিকে “নিষিদ্ধ” বলে ঘোষণা করে, বিক্রেতাকে ভয় দেখিয়ে, পাঠকের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে। ধীরে ধীরে মানুষ বইটির কাছে যাওয়ার আগেই শিখে যায়—কিছু প্রশ্ন করা বিপজ্জনক, কিছু স্মৃতি পড়া অনুচিত, কিছু নাম উচ্চারণ করলে ঝামেলা হতে পারে। এভাবেই ইতিহাসের দরজায় তালা পড়ে; প্রথমে প্রতীকী, পরে বাস্তব।
অসমাপ্ত আত্মজীবনী বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রথম-ব্যক্তির দলিল। ইউপিএলের প্রকাশনা-তথ্য অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি পুরোনো খাতা ২০০৪ সালে তাঁর মেয়ে শেখ হাসিনার হাতে আসে। তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আত্মজীবনী লেখা শুরু করেছিলেন; বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এতে তাঁর শৈশব, রাজনৈতিক জীবনের সূচনা, ভাষা আন্দোলন এবং দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব বাংলার নানা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।
এই বই পড়া মানে লেখকের প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা নয়। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন, নীতি ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে—উঠতে হবে। আত্মজীবনীও পূর্ণাঙ্গ বা নিরপেক্ষ ইতিহাস নয়; এটি লেখকের নিজের সময় ও জীবন সম্পর্কে তাঁর বিবরণ। পাঠক সেটিকে অন্য দলিল, সংবাদপত্র, স্মৃতিকথা ও গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে পড়বেন। সেই স্বাধীনতাই ইতিহাসচর্চার প্রাণ। একজন নেতাকে প্রশ্ন করার অধিকার যেমন জরুরি, তাঁর লেখা পড়ার অধিকারও তেমনই জরুরি।
কিন্তু বইটির বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত আর বইটিকে বিক্রি হতে না দেওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটি মতপ্রকাশ; দ্বিতীয়টি অন্যের মতপ্রকাশ ও জানার সুযোগে বাধা। কেউ বইটির সম্পাদনা, বক্তব্য বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সমালোচনা করতে পারেন। সেই সমালোচনা হোক প্রবন্ধে, আলোচনায়, গবেষণায়, পাল্টা বইয়ে। দোকানের শাটার নামিয়ে যুক্তির জবাব দেওয়া যায় না।
আইনেও নিষেধাজ্ঞার একটি আনুষ্ঠানিক পথ আছে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং আইনসাপেক্ষে বাক্স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯এ ধারায় নির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে বই বাজেয়াপ্ত ঘোষণার ব্যবস্থা আছে; ৯৯বি ধারায় সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিষিদ্ধ করার কোনো গেজেট বা আদালতের আদেশের উল্লেখ নেই; ইউপিএলও এমন আদেশের কথা জানে না বলে বলেছে।
তাই প্রশ্নটি শুধু—“বইটি নিষিদ্ধ কি না?”—এতটুকুতে থেমে থাকতে পারে না। প্রশ্ন করতে হবে, কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা না থাকলে বিক্রি বন্ধের শর্ত এল কোথা থেকে? কর্মীদের ফাঁড়িতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল? তাঁদের নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার নিশ্চিত হয়েছিল কি? বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো এক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; আবার ক্ষমতার পালাবদলে তাকে মুছে ফেলা বা নতুন করে সাজিয়ে দেওয়ার উপকরণও নয়। সেই ইতিহাসে গৌরব আছে, ভুল আছে, বিতর্ক আছে, নানা মানুষের অবদান আছে। সত্যিকারের ইতিহাসচর্চা সব কণ্ঠকে শুনতে চায়—কোনো নেতাকে দেবতা বানাতে নয়, কাউকে অন্ধকারে ঠেলে দিতেও নয়।
বইয়ের দোকানের কর্মীরা যেন রাজনৈতিক প্রতীকের লক্ষ্যবস্তু না হন। পাঠক যেন বই হাতে নেওয়ার আগে অনুমতির অপেক্ষা না করেন। আর রাষ্ট্র যেন স্পষ্ট করে—নিষেধাজ্ঞা থাকলে তার আইনি ভিত্তি কী, না থাকলে কে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। বইয়ের পাতায় ইতিহাস অসমাপ্ত থাকতে পারে; কিন্তু তাকে পড়ার অধিকার অসমাপ্ত রাখা যায় না।
একটি উদ্ধৃতি টেনে আজকের কলামের ইতি টানছি ইতিহাসের ওপর ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে — জর্জ অরওয়েল, Nineteen Eighty-Four
“Who controls the past controls the future: who controls the present controls the past.”
ভাবানুবাদ: “যে অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করে, সে ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করে; যে বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে, সে অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করে।”
উপন্যাসে এটি শাসক দলের স্লোগান—অরওয়েলের নিজের সরাসরি উক্তি নয়।
➖➖➖➖➖➖
মতামত: লেখকের নিজস্ব।
মাহবুব আহমেদ | বাংলাদেশি-আমেরিকান উদ্যোক্তা, লেখক, সম্পাদক ও নাগরিক অধিকারকর্মী।
#অসমাপ্ত_আত্মজীবনী #বইয়ের_স্বাধীনতা #প্রকাশনার_স্বাধীনতা #ইতিহাসচর্চা #মতপ্রকাশের_স্বাধীনতা #বাংলাবাজার #মাহবুব_আহমেদ #মতামত




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।