ইরান যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি: কী ঘটছে, সত্য কী

————— ————— ———— ————
এক মাসের আপেক্ষিক বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার সরাসরি হামলা চালিয়েছে। ইরান দুর্বল হয়েছে, কিন্তু পরাজিত নয়; যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েও রাজনৈতিক সমাধান পায়নি। আর যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও জ্বালানিনির্ভর বিশ্ব।
————— ————— ———— ————
মাহবুব আহমেদ। আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি।
যুদ্ধ থামেনি—কেবল তার গতি বদলেছিল
দক্ষিণ ইরানের হরমুজ উপকূলের কাছে একটি বিয়েবাড়ি। উৎসবের সেই বাড়িতে এখন শোক। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের একটি হামলায় সেখানে পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম আহতের সংখ্যা ৬৮ বলে জানিয়েছে; নিহতদের মধ্যে চার বছরের একটি শিশুও রয়েছে বলে তাদের দাবি।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো ওই নির্দিষ্ট বেসামরিক স্থানে আঘাতের অভিযোগ স্বীকার বা ব্যাখ্যা করেনি। ফলে ঘটনাটির লক্ষ্য, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং বেসামরিক হতাহতের পূর্ণ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে বৃহত্তর সত্যটি স্পষ্ট: ইরানের যুদ্ধ শেষ হয়নি। জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতা ভেঙে পড়া এবং জুলাইয়ের শেষ ভাগের পর প্রায় এক মাস তুলনামূলক শান্ত থাকার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার সরাসরি আক্রমণ–পাল্টা আক্রমণে ফিরেছে।
১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, নৌসম্পদ, মাইন স্থাপনের সক্ষমতা ও যোগাযোগকেন্দ্রে ধারাবাহিক হামলা চালানোর কথা জানায়। এর জবাবে ইরান জর্ডানে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বাহরাইনের একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর দাবি করে।
ইরান দাবি করেছে, জর্ডানে তাদের হামলায় বহু মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের আকাশসীমায় ঢোকা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১০টি ধ্বংস করা হয়েছে; বাকি তিনটি জনবসতিহীন স্থানে পড়েছে।
এই দুই বক্তব্য একসঙ্গে সত্য হতে পারে না। স্বাধীন প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত ইরানের ব্যাপক মার্কিন হতাহতের দাবি অযাচাইকৃত বলেই বিবেচিত হবে।
নতুন সংঘর্ষের তাৎক্ষণিক সূত্র
ওয়াশিংটনের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন হামলার পেছনে তিনটি ঘটনা কাজ করেছে:
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কথিত নতুন মাইন স্থাপনের চেষ্টা;
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটির দিকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ;
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আক্রমণ।
৩১ আগস্ট হরমুজ প্রণালির কাছে সৌদি তেলবাহী দুটি সুপারট্যাংকার—সৌদি পতাকাবাহী Sidr এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী Senegal Prosperity—অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতের শিকার হয়। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। কোনো নাবিক হতাহত হননি।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস আঘাতের খবর নিশ্চিত করলেও কারা হামলা করেছে, তা স্বাধীনভাবে নির্ধারিত হয়নি। ইরান দায় স্বীকার করেনি। অতএব হামলার জন্য তেহরানকে সরাসরি দায়ী করা এই পর্যায়ে প্রমাণের চেয়ে অনুমানকে এগিয়ে রাখা হবে।
তবে হামলাটি যে অঞ্চলে হয়েছে এবং ইরান যে দীর্ঘদিন ধরে হরমুজে জাহাজ চলাচলকে কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করছে—এই প্রেক্ষাপট তেহরানের ওপর সন্দেহ বাড়িয়েছে।
এই যুদ্ধ শুরু হলো কীভাবে
বর্তমান সংঘাতের সূচনা ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা, পারমাণবিক কর্মসূচিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়া এবং তেহরানকে নতুন রাজনৈতিক সমঝোতায় বাধ্য করা।
যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ইরানের সামরিক স্থাপনা, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌঘাঁটি, পারমাণবিক অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে গুরুতর আঘাত আসে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং পরে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
তবে প্রত্যাশিত দ্রুত রাজনৈতিক পতন ঘটেনি। বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো আরও কঠোর হয়েছে। সাবেক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারবারা লিফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আক্রমণের ফলে পশ্চিমাপন্থী নতুন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পরিবর্তে আরও কঠোর ও র্যাডিক্যাল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এটি যুদ্ধের একটি মৌলিক শিক্ষা: কোনো সরকারের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং সেই সরকারকে রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করানো এক বিষয় নয়।
ইরান কতটা দুর্বল হয়েছে
মে মাসে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার কংগ্রেসে দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ১৬১টি নৌযান ধ্বংস এবং দেশটির প্রায় ৮২ শতাংশ বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি বিমানবাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাও হারিয়েছে।
এসব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মূল্যায়ন; ইরান পরিসংখ্যানগুলো স্বীকার করেনি এবং সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে স্যাটেলাইট ছবি, হামলার বিস্তৃতি এবং ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার ধরন থেকে দেশটির প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর্যাপ্ত ইঙ্গিত রয়েছে।
তারপরও ইরান পরাজিত নয়। দেশটির হাতে এখনো তিনটি কার্যকর অস্ত্র রয়েছে:
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও স্বল্পমূল্যের আক্রমণাত্মক ড্রোন;
হরমুজ প্রণালিতে মাইন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌযানের মাধ্যমে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার সক্ষমতা;
ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক।
ইরানের কৌশল এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচলিত যুদ্ধে পরাজিত করা নয়। বরং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য এত বাড়ানো, যাতে ওয়াশিংটনের জন্য সংঘাত চালিয়ে যাওয়া অসহনীয় হয়ে ওঠে।
হরমুজ—যুদ্ধের আসল কেন্দ্র
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত। যুদ্ধের আগে বিশ্বের ব্যবহৃত তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। কাতারের বিপুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির পথও এটি।
ফলে হরমুজে একটি মাইন, একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা একটি জাহাজে আগুনের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ঢেউ পৌঁছে যায় যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রলপাম্প, ইউরোপের কারখানা এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও এলএনজি আমদানি ব্যয়ে।
জুলাইয়ে জুনের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর হরমুজে ট্যাংকার চলাচল আবার কমে যায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএর আগস্টের হিসাবে:
জুলাইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব অবস্থার চেয়ে দৈনিক ৮৩ লাখ ব্যারেল কম ছিল;
২০২৬ সালে বিশ্ব তেল সরবরাহ দৈনিক গড়ে ৪৩ লাখ ব্যারেল কমতে পারে;
তৃতীয় প্রান্তিকে সরবরাহ–চাহিদার ঘাটতি দৈনিক ১৮ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সেপ্টেম্বরের নতুন সংঘর্ষের খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক দিনে ব্যারেলপ্রতি চার ডলারের বেশি বেড়ে পাঁচ সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ: নিষেধাজ্ঞার চেয়েও কঠিন
১৪ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলের ওপর নতুন করে কার্যকর নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, তারপর প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে হরমুজ পার হয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন ইরানি অপরিশোধিত তেল চীনে পৌঁছায়নি।
বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার ও ভরটেক্সার হিসাবে, ইরানের তেল ও কনডেনসেট লোডিং:
মার্চে ছিল দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল;
জুলাইয়ে নেমে আসে প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে;
আগস্টে দাঁড়ায় আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেল।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ইরানের পুরো উপকূল ঘিরে রাখেনি। ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থলে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজ যাচাই ও আটকে দিচ্ছে। এর আইনগত ভিত্তি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রয়োগ এবং সংঘাত আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি দাবি করেছেন, দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার মজুত যথেষ্ট এবং প্রয়োজনে বাজারে ২০০ কোটি ডলার ছাড়া হবে। কিন্তু ইরানি রিয়াল ডলারের বিপরীতে রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমেছে; জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশ হতে পারে বলে হিসাব করেছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্র এখনো ভেঙে পড়েনি, কিন্তু সাধারণ ইরানিদের আয়, সঞ্চয় ও খাদ্যনিরাপত্তা দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে।
পারমাণবিক প্রশ্নের সমাধান হয়নি
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের হামলায় ইরানের তিনটি পরিচিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে ইরানের সম্ভাব্য “ব্রেকআউট টাইম”—একটি বোমার জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রমানের উপাদান তৈরির সময়—যুদ্ধের আগে আনুমানিক ছয় মাস থেকে বেড়ে এক বছর পর্যন্ত হয়েছে।
কিন্তু এই হিসাবের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো পরিদর্শনের অনুপস্থিতি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত যাচাই চালাতে পারেনি। প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাসরি অস্ত্র নয়, তবে আরও সমৃদ্ধ করা হলে তুলনামূলক দ্রুত অস্ত্রমানের স্তরে নেওয়া সম্ভব।
ইরান বরাবরই বলেছে, তারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চায় না। কিন্তু পরিদর্শন বন্ধ, উপাদানের অবস্থান অনিশ্চিত এবং গোপন স্থাপনার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে সামরিক হামলা সমস্যাটি ধ্বংস না করে আরও অস্বচ্ছ করে তুলেছে।
মানবিক মূল্য: সবচেয়ে অনির্ভরযোগ্য অথচ সবচেয়ে জরুরি হিসাব
যুদ্ধের হতাহতের নির্ভুল মোট সংখ্যা নেই। ইরানের ভেতরে সংবাদপ্রবাহ, ইন্টারনেট এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে সামরিক ও বেসামরিক মৃত্যুর হিসাব আলাদা করা কঠিন।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ইরান জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। সংখ্যাটি ইরানি কর্তৃপক্ষের; জাতিসংঘ বা স্বাধীন কোনো পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান এখনো তা নিশ্চিত করেনি। মার্চের শুরুতেই ইরানের জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ১ হাজার ৩৩২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার দাবি করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র আগস্টের শুরু পর্যন্ত ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইরাকের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সেখানে অন্তত ১১৭ জন নিহত হওয়ার হিসাব দেয়। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক সংঘর্ষে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতসহ একাধিক দেশেও বেসামরিক ও সামরিক প্রাণহানি ঘটেছে।
এই সংখ্যাগুলো একই তারিখের নয় এবং এগুলো যোগ করে নির্ভুল মোট মৃত্যুসংখ্যা তৈরি করা যাবে না। যুদ্ধের তথ্যযুদ্ধে হতাহতদের সংখ্যাও রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
তবে আইনগত নীতিটি পরিষ্কার: সামরিক লক্ষ্য ও বেসামরিক মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা, সমানুপাতিক শক্তি ব্যবহার এবং বেসামরিক ক্ষতি কমানোর সম্ভাব্য সব সতর্কতা নেওয়া—সব পক্ষের বাধ্যবাধকতা। বিয়েবাড়ি, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, জাহাজ কিংবা বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলার প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে।
যুদ্ধের বৈধতা ও নৈতিক প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের অভিযানকে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ইরান বলছে, তারা জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষা করছে।
কিন্তু আত্মরক্ষার দাবি উচ্চারণ করলেই যেকোনো হামলা বৈধ হয়ে যায় না। আন্তর্জাতিক আইনে আসন্ন হুমকি, প্রয়োজনীয়তা, সমানুপাতিকতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা বিবেচ্য। একইভাবে, ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার বেসামরিক জাহাজ, আবাসিক এলাকা বা সংঘাতে সরাসরি অংশ না নেওয়া তৃতীয় দেশের ওপর নির্বিচার হামলার অনুমতি দেয় না।
মার্চে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের আবাসিক এলাকা ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানিয়েছিল। কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলোর ভেটো ও ভূরাজনৈতিক বিভাজনের কারণে পরিষদ যুদ্ধের সূচনা, সামরিক অভিযান এবং সব পক্ষের সম্ভাব্য লঙ্ঘন নিয়ে সমানভাবে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি।
কেন জুনের সমঝোতা টিকল না
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, কোন জাহাজ কীভাবে চলবে, মার্কিন অবরোধ কখন উঠবে এবং ইরান কী ধরনের পারমাণবিক নিশ্চয়তা দেবে—এসব বিষয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা আলাদা ছিল।
জুলাইয়ে সংঘর্ষ আবার শুরু হয়। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলার বদলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু মাসের শেষে লারাক দ্বীপ, জর্ডানের ঘাঁটি এবং ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় সেই সাময়িক বিরতি ভেঙে যায়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১ সেপ্টেম্বর বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জুনের সমঝোতার অঙ্গীকারে ফিরলে তেহরানও সঙ্গে সঙ্গে তা মানবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা বলেছেন, নতুন কোনো চুক্তির সম্ভাবনা তিনি খুব কম দেখছেন এবং ইরান আবার প্রতিশোধ নিলে আরও বড় হামলা হবে।
অর্থাৎ দুই পক্ষই আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি, কিন্তু তারা একে অপরকে বিশ্বাসও করে না।
কেউ কি জিতছে?
সামরিক মানদণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের প্রচলিত বাহিনীর বিপুল ক্ষতি করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক মানদণ্ডে তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি:
ইরান আত্মসমর্পণ করেনি;
শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি;
পারমাণবিক উপাদানের অবস্থান আরও অনিশ্চিত;
হরমুজে নিরাপদ ও স্বাভাবিক নৌচলাচল ফেরেনি;
যুদ্ধ আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সিদেরও টেনে এনেছে।
অন্যদিকে ইরান হরমুজকে কার্যকর চাপের অস্ত্র বানালেও তার অর্থনীতি বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে, সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হচ্ছে। জাহাজ চলাচল বন্ধ করে তেহরান প্রতিপক্ষকে আঘাত করছে, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক আয়ের পথও বন্ধ করছে।
সুতরাং এই যুদ্ধে আপাতত কোনো বিজয়ী নেই। আছে সামরিক অসমতা, পারস্পরিক ক্ষয় এবং ভুল হিসাব থেকে বৃহত্তর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার বিপদ।
আমরা যা জানি
১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বিমান প্রতিরক্ষা, রাডার, নৌ ও যোগাযোগ স্থাপনায় নতুন হামলা চালিয়েছে।
ইরান জর্ডান ও বাহরাইনের মার্কিন অবস্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে।
জর্ডান ১৩টি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত এবং ১০টি ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে।
হরমুজে সৌদি তেলবাহী দুটি সুপারট্যাংকার আক্রান্ত হয়েছে; কোনো নাবিক হতাহত হননি।
ইরানি তেল রপ্তানি মার্চের দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল থেকে আগস্টে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার–২ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেলে নেমেছে।
জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত অকার্যকর।
যুদ্ধের ফলে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামুদ্রিক বাধা সৃষ্টির ক্ষমতা রয়ে গেছে।
যা এখনো অস্পষ্ট
ট্যাংকার দুটিতে কারা হামলা করেছে।
বিয়েবাড়িতে আঘাতটি লক্ষ্যভ্রষ্ট মার্কিন অস্ত্র, ভুল গোয়েন্দা তথ্য নাকি অন্য কোনো ঘটনার ফল।
ইরানের সর্বশেষ হামলায় মার্কিন সেনা হতাহতের দাবি সত্য কি না; প্রাথমিক মার্কিন তথ্য তা নাকচ করেছে।
ইরানের ৪৪০ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথায় রয়েছে।
ইরানের মোট বেসামরিক ও সামরিক মৃত্যুসংখ্যা।
দুই পক্ষ পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরবে, নাকি আবার সীমিত সমঝোতার পথে যাবে।
সম্পাদকীয় মূল্যায়ন
এই সংঘাতকে শুধু “ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র” বললে বাস্তবতা ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে পারমাণবিক নিরাপত্তা, নৌপথের স্বাধীনতা, জ্বালানি অর্থনীতি, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের সংকট।
ইরানের স্বৈরতান্ত্রিক দমননীতি বা আঞ্চলিক সশস্ত্র নেটওয়ার্কের সমালোচনা যুক্তিসংগত; কিন্তু তা ইরানি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু কিংবা অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধকে বৈধ করে না। একইভাবে, বিদেশি হামলার শিকার হওয়া ইরানকে বেসামরিক জাহাজ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর নির্বিচার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অধিকার দেয় না।
যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক মিথ্যা হলো—আর একটি হামলাই প্রতিপক্ষকে নত করবে। ছয় মাসের অভিজ্ঞতা বরং দেখিয়েছে, প্রতিটি “শেষ আঘাত” পরবর্তী প্রতিশোধের প্রথম কারণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র ও যাচাই নোট
এই প্রতিবেদন ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ঘটনাস্থলভিত্তিক প্রতিবেদনকে আইএইএ, আইইএ ও জাতিসংঘের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও সংশ্লিষ্ট সামরিক বাহিনীর দাবি স্বাধীন প্রমাণ না থাকলে স্পষ্টভাবে দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার ও ইরানের সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে হতাহতের পূর্ণ হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রধান সূত্র
#IranWar #IranConflict #StraitOfHormuz #MiddleEastCrisis #USIran #ইরানযুদ্ধ #মধ্যপ্রাচ্য #বিশ্বসংবাদ




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।