সোহরাওয়ার্দী উদ্যান: ভাস্কর্য নাকি ফোয়ারা, কী বলছে সরকার

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে ভাস্কর্যের বদলে পানির ফোয়ারা বসানোর প্রস্তাবের কথা একটি মন্ত্রণালয়-নথিতে এসেছে বলে জানিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেছেন, এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তাই এখন শুধু নকশার নয়—রাষ্ট্র কীভাবে ইতিহাস সংরক্ষণ করবে, সেটিরও।
পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন
নথির প্রস্তাব, মন্ত্রীর অস্বীকৃতি
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৭১ সালের দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ—প্রকল্পের নকশায় কীভাবে তুলে ধরা হবে, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৬ আগস্টের অগ্রগতি প্রতিবেদনে প্রকল্পের “রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং”-এর অংশ হিসেবে ওই দুই স্থানে ভাস্কর্যের বদলে পানির ফোয়ারা স্থাপনের প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। একই নথিতে ৭ মার্চের ভাষণের পরিকল্পিত হলোগ্রাফিক ত্রিমাত্রিক উপস্থাপনায় পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ ছিল।
তবে প্রস্তাব আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, আত্মসমর্পণের স্থানে ফোয়ারা বসানোর কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। তাঁর ভাষ্য, সরকার স্বাধীনতা স্তম্ভ প্রকল্প কীভাবে সম্পন্ন করা যায়, তা পর্যালোচনা করছে। মন্ত্রণালয়ও এর আগে জানিয়েছিল, বর্তমান সরকার প্রকল্পটি পর্যালোচনা করছে এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করছে।
এখানে মূল প্রশ্নটি তাই “ফোয়ারা বসছে কি না”র চেয়ে বিস্তৃত: নথিতে থাকা প্রস্তাবটি কে, কখন এবং কোন প্রক্রিয়ায় তৈরি করেছে—আর প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা কে অনুমোদন করবে?
একই মাঠে ভাষণ ও আত্মসমর্পণের ইতিহাস
বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একসময় রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সেখানেই শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত হয়ে ওঠে। ভাষণটি ২০১৭ সালে ইউনেস্কোর “মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড” আন্তর্জাতিক নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত হয়।
একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর এই মাঠেই পাকিস্তানি বাহিনী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ দিনটিকে বিজয় দিবস হিসেবে উল্লেখ করে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণকে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে যুক্ত করে।
এই দুই ঘটনার স্মৃতি উদ্যানটিকে শুধু নাগরিক বিনোদনের স্থান হিসেবে নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিভূমি হিসেবেও চিহ্নিত করে। সরকারি পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটের বর্ণনাতেও স্বাধীনতা স্তম্ভকে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি স্মরণে নির্মিত জাতীয় স্মারক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বহু বছরের প্রকল্প, পাল্টানো নকশা
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়; বিডিনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। আগের পরিকল্পনায় ৭ মার্চের ভাষণ, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণের সঙ্গে যুক্ত স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের কথা ছিল। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৬৫ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর দুই স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ থেমে যায় এবং নির্মাণস্থলে ভাঙচুর হয় বলে বিডিনিউজ জানিয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার ভাস্কর্য দুটি নির্মাণ করা হবে না বলে জানায়। এরপর প্রকাশিত অগ্রগতি-নথিতে ফোয়ারার প্রস্তাব উঠে আসে—যা নিয়ে মন্ত্রী এখন বলছেন, ধারণাটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
অর্থাৎ, নকশার পরিবর্তন এক সরকারের সিদ্ধান্তে শুরু হয়ে আরেক সরকারের কাছে এসে থেমেছে—এমন সরল রেখা এখানে নেই। বিভিন্ন সময়ের পরিকল্পনা, প্রকল্পের প্রশাসনিক নথি এবং বর্তমান মন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়ে গেছে।
স্মৃতিচিহ্ন কীভাবে ইতিহাস বলে?
ফোয়ারা নিজে কোনো স্মৃতিচিহ্ন হতে পারে; কিন্তু সেটি কোন ঘটনার স্মৃতি বহন করবে, তা নির্ভর করে নকশা, ব্যাখ্যা, ফলক, সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতার ওপর। এই উদ্যানেই আগে থেকে জলাধার, ফোয়ারা, চিরন্তন শিখা, দেয়ালচিত্র এবং ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘরসহ নানা উপাদান রয়েছে। বিডিনিউজের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জাদুঘরের ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা, প্রদর্শনীসামগ্রীর ক্ষয়ক্ষতি এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকার কথা উঠে এসেছিল।
তাই নকশা বদলের পক্ষে যুক্তি থাকতে পারে—কোনো স্থানে ভাস্কর্যের বদলে অন্য ধরনের উপস্থাপনা হয়তো স্থাপত্যগতভাবে উপযোগী, কিংবা প্রকল্পের বাকি অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সেই যুক্তি যাচাই করতে হলে সরকারকে প্রস্তাবিত নকশা, ব্যয়, ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এবং জনসাধারণের জন্য স্থানটির ব্যবহার কীভাবে বদলাবে—এসব প্রকাশ করতে হবে।
অন্যদিকে সমালোচকদের উদ্বেগ, ভাস্কর্য সরিয়ে সাধারণ ফোয়ারা বসালে ঐতিহাসিক ঘটনাদুটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কাকে রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া বা প্রমাণ ছাড়া “ইতিহাস মুছে ফেলা” বলে চূড়ান্ত করা—দুটিই তাড়াহুড়ো হবে। নকশার বাস্তব চেহারা এবং তার ব্যাখ্যা না দেখে উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য দরকার স্বচ্ছতা
মন্ত্রী বলেছেন, আত্মসমর্পণের স্থানে ফোয়ারা বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং সরকার স্বাধীনতা স্তম্ভ প্রকল্পের “মূল চেতনা” ধরে রেখে কাজ সম্পন্ন করার পথ দেখছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদনে প্রস্তাবটি কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো, তার ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। বিডিনিউজ জানিয়েছে, নথিতে স্বাক্ষর থাকা এক কর্মকর্তা স্বাক্ষরের কথা স্বীকার করলেও সংবাদমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি নেই বলে জানান।
প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে সংশোধিত নকশা, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, ব্যয়ের পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক উপস্থাপনার পরিকল্পনা প্রকাশ করা জরুরি। ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ—দুটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা। এগুলোকে স্মরণ করার পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে; সেই মতভেদ মেটানোর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য উপায় হলো নথি প্রকাশ, ইতিহাসবিদ ও স্থপতিদের মতামত নেওয়া এবং জনসাধারণকে আলোচনায় যুক্ত করা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভবিষ্যৎ নকশা এখনো চূড়ান্ত নয়। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে রাষ্ট্রের দায় কেবল নির্মাণ শেষ করা নয়; স্থানটির ইতিহাস যেন নতুন প্রজন্মের কাছে দৃশ্যমান, নির্ভুল ও বোধগম্য থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা।
কী জানা গেছে / কী এখনো স্পষ্ট নয়
যা জানা গেছে
মন্ত্রণালয়ের ৬ আগস্টের অগ্রগতি প্রতিবেদনে দুই ঐতিহাসিক স্থানে ভাস্কর্যের বদলে ফোয়ারা স্থাপনের প্রস্তাবের কথা আছে বলে বিডিনিউজ জানিয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, এ বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত নেই; প্রকল্পটি পর্যালোচনাধীন।
প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।
যা এখনো স্পষ্ট নয়
নথিতে থাকা প্রস্তাবটি ঠিক কোন পর্যায়ে তৈরি ও বিবেচিত হয়েছিল।
সংশোধিত নকশা, ব্যয় এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া কী হবে।
ঐতিহাসিক স্থান দুটির পরিচিতি ও ব্যাখ্যা নতুন নকশায় কীভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
সূত্র ও যাচাই-নোট
প্রতিবেদনটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২৬ ও ৩০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন, মন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্য, দ্য ডেইলি স্টারের প্রকল্প-সংক্রান্ত পুরোনো প্রতিবেদন, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বিজয় দিবস-তথ্য এবং ইউনেস্কোর নথির ভিত্তিতে লেখা। মূল ৬ আগস্টের মন্ত্রণালয়-নথিটি স্বাধীনভাবে হাতে পাওয়া যায়নি; নথির বিষয়বস্তু বিডিনিউজের প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। অতএব, ফোয়ারা স্থাপনের বিষয়টি প্রস্তাব হিসেবে প্রতিবেদিত, চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
#সোহরাওয়ার্দীউদ্যান #মুক্তিযুদ্ধ #৭মার্চ #বিজয়দিবস #স্বাধীনতাস্তম্ভ #বাংলাদেশেরইতিহাস #ঢাকা
সরাসরি সূত্র




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।