অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রি নিয়ে বাংলাবাজারে কী ঘটেছিল

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রির প্রতিবাদে ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বিক্রয়কেন্দ্রে তালা ঝোলানো হয়। দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয় এবং তাঁদের মুক্তির সময় বইটি আর বিক্রি না করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য। প্রকাশক বলছে, বইটির ওপর কোনো সরকারি বা আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা তাদের জানা নেই।
শাটার নামল, কর্মীদের নেওয়া হলো ফাঁড়িতে
২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ঢাকার বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্রে দুই ব্যক্তি অসমাপ্ত আত্মজীবনী কিনতে চান। কর্মীরা বইটি বের করার পর তাঁরা বলেন, বইটি নিষিদ্ধ—এটি বিক্রি করা হচ্ছে কেন? পরে আরও লোক জড়ো হয়, বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে তালা দেওয়া হয় এবং দুই কর্মীকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাটি প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও bdnews24.com-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
কর্মী আমিনুল ইসলাম ও হুমায়ুন কবীরকে থানায় নয়, ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছিল বলে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান প্রথম আলোকে জানান। তাঁর ভাষ্য, বইটি আর বিক্রি করা হবে না—এই শর্তে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, বইটি ২০২৪ সালের পর পুনর্মুদ্রিত হয়নি এবং এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ জমা পড়েনি।
তবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ আছে। ডেইলি স্টারকে ফরিদাবাদ ফাঁড়ির ইনচার্জ বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে এবং বিক্রয়কেন্দ্রটি আবার খোলা হয়েছে। অন্যদিকে, লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার জাগো নিউজকে বলেন, পুলিশ দোকানে তালা দেয়নি—এক ব্যক্তি তালা দিয়েছিলেন; কর্মীদের ফাঁড়িতে নেওয়ার পর তাঁরা ছাড়া পেয়েছেন, কারণ বইটি নিষিদ্ধ নয়। কোনো অভিযোগও করা হয়নি বলে তিনি জানান।
‘নিষিদ্ধ’ দাবির বিপরীতে প্রকাশকের বক্তব্য
ইউপিএল ২৯ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে জানায়, বইটি নিষিদ্ধ বলে তাদের জানা নেই। কোনো সরকারি বা আদালতের সিদ্ধান্ত হলে আইন মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; কিন্তু যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া চাপের মুখে বইয়ের বিপণন বন্ধ করার প্রশ্ন নেই—এটাই প্রকাশকের অবস্থান। সংস্থাটি বলেছে, পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনার ভিত্তিতে তারা বই প্রকাশ করে এবং প্রকাশিত বইয়ের দায়িত্ব নেয়।
বইটির বিক্রি বন্ধের দাবি যাঁরা তুলেছিলেন, তাঁদের বক্তব্য বা পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো তথ্য প্রকাশিত হয়নি। bdnews24.com-কে সূত্রাপুর থানার ওসি বলেছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয় বিএনপি কর্মী। তবে কোনো ব্যক্তির নাম, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা তদন্তের ফল তখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই রাজনৈতিক পরিচয়ের ওই তথ্যটি পুলিশের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সত্য হিসেবে নয়।
বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি বা সমালোচনার অধিকার আছে। কোনো পাঠক লেখকের রাজনৈতিক মূল্যায়ন, বর্ণনার নির্বাচন কিংবা স্মৃতির নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু বইটি নিষিদ্ধ—এ দাবির পক্ষে এই ঘটনায় কোনো আদালতের আদেশ বা সরকারি প্রজ্ঞাপনের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। আপত্তি থাকলে তার উত্তর হতে পারে আলোচনা, গবেষণা, সমালোচনা বা পাল্টা লেখা; জোর করে বিক্রি বন্ধের চেষ্টা সেই আলোচনার বিকল্প নয়।
বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব—এবং আত্মজীবনীর সীমা
ইউপিএলের প্রকাশনা-তথ্য অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি পুরোনো খাতা ২০০৪ সালে তাঁর মেয়ে শেখ হাসিনার হাতে আসে। তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আত্মজীবনী লেখা শুরু করেছিলেন। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এতে তাঁর শৈশব, ছাত্রজীবন, দেশভাগ-পরবর্তী রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট এবং ১৯৫০-এর দশকের পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এটি একটি রাজনৈতিক নেতার নিজের সময় ও জীবন সম্পর্কে প্রথম-ব্যক্তির বিবরণ—সেই কারণে ইতিহাসচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস। একই সঙ্গে আত্মজীবনী কোনো নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসগ্রন্থ নয়: লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলে। তাই গবেষক ও পাঠকের জন্য বইটির বক্তব্যকে সমসাময়িক দলিল, সংবাদপত্র, অন্য রাজনৈতিক নেতার স্মৃতিকথা ও গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যুক্তিসংগত। এই সতর্ক পাঠ বইটির মূল্য কমায় না; বরং ইতিহাস বোঝার কাজকে আরও সমৃদ্ধ করে।
নিষেধাজ্ঞার দাবি যাচাই হবে কোন পথে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং আইনসাপেক্ষে বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯এ ধারায় নির্দিষ্ট আইনি কারণ দেখিয়ে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে কোনো বই বা প্রকাশনার কপি বাজেয়াপ্ত ঘোষণার ব্যবস্থা রয়েছে; ৯৯বি ধারায় সেই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করার সুযোগও আছে।
এই ধারাগুলো থেকে নির্দিষ্ট ঘটনার আইনি সিদ্ধান্ত টানা যায় না—সেটি আইনজীবী বা আদালতের কাজ। তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এ ঘটনায় কোনো গেজেট প্রজ্ঞাপন, আদালতের আদেশ বা আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার উল্লেখ মেলেনি। পুলিশের একজন কর্মকর্তা বইটি বিক্রি বন্ধের শর্তে কর্মীদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন; অন্য এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, পুলিশ দোকানে তালা দেয়নি এবং বইটি নিষিদ্ধ নয়। এই দুই বক্তব্যের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে: আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা না থাকলে, বই বিক্রি বন্ধের শর্ত কে দিল এবং কোন কর্তৃত্বে?
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং কর্মীদের ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখার অভিযোগে পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির বক্তব্য, বই নিয়ে দ্বিমত বা সমালোচনা শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মতভাবে জানানো যায়; চাপ বা বলপ্রয়োগে প্রকাশনা ও বিক্রি বাধাগ্রস্ত করা যায় না।
মতবিরোধ থাকবে, সিদ্ধান্তের পথও হতে হবে স্বচ্ছ
ঘটনার পর ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্র খুলেছে বলে ডেইলি স্টার জানিয়েছে। কিন্তু কে তালা দিয়েছিল, কর্মীদের ফাঁড়িতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়েছিল, তাঁদের মুক্তির শর্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কে নির্ধারণ করেছিল—এসব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর প্রকাশিত তথ্য থেকে এখনো স্পষ্ট নয়। কোনো পক্ষ থানায় অভিযোগ না করায় ঘটনার তদন্ত বা জবাবদিহির অগ্রগতিও অনিশ্চিত।
শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ও শাসন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভিন্নমত আছে—তা গণতান্ত্রিক আলোচনার অংশ। কিন্তু কোনো বইয়ের ওপর আপত্তি, কোনো পাঠকের বই কেনা, কিংবা প্রকাশকের বিপণন—এসব প্রশ্নে নিয়ম নির্ধারণ করবে আইন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক মতবিরোধের ভার বইয়ের দোকানের কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিলে, ক্ষতি হয় শুধু একটি প্রকাশকের নয়; পাঠকের জানার অধিকার এবং প্রকাশনা-জগতের স্বাধীনতারও।
কী জানা গেছে / কী এখনো অস্পষ্ট
যা জানা গেছে: ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে বই বিক্রি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়; দোকানে তালা পড়ে; দুই কর্মীকে ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয় এবং পরে তাঁরা মুক্তি পান। ইউপিএল জানিয়েছে, বইটির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞার কথা তাদের জানা নেই। ডেইলি স্টার ২৯ সেপ্টেম্বর জানায়, বিক্রয়কেন্দ্রটি আবার খুলেছে।
যা এখনো অস্পষ্ট: তালা দেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য, পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মীদের নেওয়া এবং বিক্রি বন্ধের শর্ত দেওয়ার সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, এবং কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। পুলিশ ও প্রকাশকের বর্ণনায় কিছু পার্থক্যও রয়েছে।
উৎস ও যাচাই নোট
প্রতিবেদনটি ইউপিএলের প্রকাশনা-তথ্য ও বিবৃতি, বাংলাদেশের সংবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধি, এবং প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, bdnews24.com, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, জাগো নিউজ ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন মিলিয়ে তৈরি। পুলিশি নথি, কর্মীদের সরাসরি সাক্ষাৎকার এবং বই বিক্রি বন্ধের দাবি তোলা ব্যক্তিদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে পাওয়া যায়নি। তাই তাঁদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য সংক্রান্ত তথ্য স্পষ্টভাবে আরোপসহ উপস্থাপন করা হয়েছে।
সরাসরি সূত্র
প্রথম আলো: ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করতে বাধ্য করা হলো
দ্য ডেইলি স্টার: বিক্রয়কেন্দ্র পুনরায় খোলা এবং পুলিশের বক্তব্য
#অসমাপ্ত_আত্মজীবনী #শেখমুজিবুররহমান #ইউপিএল #প্রকাশনারস্বাধীনতা #বাকস্বাধীনতা #বাংলাদেশ #বই #আইনেরশাসন




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।