শান্তির ইউরোপে যুদ্ধের দামামা: আতঙ্ক ও প্রস্তুতির দোলাচলে সাধারণ নাগরিক

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইউরোপ মহাদেশকে ভাবা হতো বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক। তবে ভূ-রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তন এবং চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সেই চেনা ছবিকে বদলে দিয়েছে। ২০২৬ সালে এসে ইউরোপের আকাশজুড়ে এখন কেবলই সম্ভাব্য সংঘাতের কালো মেঘ। ন্যাটোর নজিরবিহীন প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি এবং মহাদেশজুড়ে ‘যুদ্ধ প্রস্তুতি’ (War Footing)-র তোড়জোড় সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও মানসিক আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
যুদ্ধের আশঙ্কায় ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় শহরে সাধারণ মানুষের মধ্যে জরুরি পণ্য মজুতের বা 'প্যানিক বায়িং'-এর হিড়িক দেখা গেছে। আমস্টারডাম, বার্লিন, ওয়ারশ এবং স্টকহোমের সুপারমার্কেটগুলোতে শুকনো খাবার, বোতলজাত পানি এবং জরুরি ওষুধপত্রের তাক প্রায়ই খালি হয়ে যাচ্ছে। ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ডের মতো সীমান্তবর্তী দেশগুলোর নাগরিকরা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কায় ঘরে জেনারেটর এবং অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করছেন। বার্লিনের এক স্টোর ম্যানেজার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিনগুলোর পর আমরা আর এমন হাহাকার দেখিনি। মানুষ ভবিষ্যতের দিনগুলো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে।"
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালে ইউরোপের জন্য প্রধান হুমকি কোনো সরাসরি ট্যাংক বা সেনা অভিযান নয়, বরং জটিল ‘হাইব্রিড বা গ্রে-জোন’ হামলা। সাইবার আক্রমণ, সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট কেবল বিচ্ছিন্ন করা, গ্যাস পাইপলাইন সাবোটাজ কিংবা বিদ্যুৎ গ্রিড অচল করে দেওয়ার মতো ঘটনা ইউরোপীয়দের দৈনন্দিন জীবনকে পঙ্গু করে দিতে পারে। এই কারণে বেলজিয়াম, জার্মানি এবং নর্ডিক দেশগুলো তাদের নাগরিকদের বাড়িতে আপদকালীন রসদ ও ডিজিটাল ব্যাকআপ রাখার প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শ দিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) একটি ‘প্রস্তুতি ইউনিয়ন’ (Preparedness Union) গড়ে তুলতে সামাজিক স্তরে কাজ করছে, যেখানে নাগরিকদের প্রাথমিক উদ্ধারকর্মী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে সরকারগুলো সামরিক প্রস্তুতি বাড়ালেও সমাজের সব স্তরের মানুষ তা মানসিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। ইউরোনিউজ (Euronews)-এর একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ইউরোপীয় নাগরিক দেশের সীমান্ত রক্ষায় সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক। এই মনস্তাত্ত্বিক অনীহা এবং সমান্তরালে বাধ্যতামূলক সামরিক চাকুরির (Conscription) পুনরুজ্জীবনের বিতর্ক তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইউরোপের ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করছে না, বরং একটি বিপজ্জনক পৃথিবীর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নাগরিকরা কতটা মানসিকভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।