ন্যাটোর নতুন কৌশল: ইউরোপের প্রতিরক্ষা এখন ইউরোপেরই দায়িত্ব

পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত সামরিক নীতির আলোকে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো (NATO) তাদের নতুন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা কৌশল উন্মোচন করেছে। নতুন এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নজিরবিহীন আর্থিক দায়বদ্ধতা। ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের পর ন্যাটোর এই নীতিগত পরিবর্তনকে স্নায়ুযুদ্ধের পর জোটের সবচেয়ে বড় রূপান্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ২০২৬ ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি (NDS) বা জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পেন্টাগনের মূল ফোকাস এখন আমেরিকার মূল ভূখণ্ড রক্ষা এবং এশিয়ায় চীনকে প্রতিহত করা। ফলে ইউরোপের প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল নেতৃত্ব এখন ইউরোপীয় মিত্রদেরই নিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল সংকটকালীন ব্যাকআপ এবং জটিল প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। এই বাস্তবতায় ন্যাটোর নতুন কৌশলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের সামরিক শক্তি দ্রুত আধুনিকীকরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
নতুন কৌশলের সবচেয়ে আলোচিত এবং বড় সিদ্ধান্ত হলো প্রতিরক্ষা বাজেটের কড়াকড়ি। পূর্বে সদস্য দেশগুলোর জন্য জিডিপির (GDP) ন্যূনতম ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে খরচের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, তা বাড়িয়ে এখন নজিরবিহীন ৫ শতাংশে উন্নীত করার আনুষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের তীব্র চাপের মুখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—যেসব দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করবে না, তাদের সুরক্ষায় জোটের স্বয়ংক্রিয় প্রতিশ্রুতি শিথিল হতে পারে।
নতুন যুদ্ধকৌশল বাস্তবায়নে উত্তর আটলান্টিক কাউন্সিল (NAC) ন্যাটোর নিজস্ব যৌথ সামরিক বাজেট বাড়িয়ে ২.৪২ বিলিয়ন ইউরো এবং বেসামরিক বাজেট ৫২৮.২ মিলিয়ন ইউরো অনুমোদন করেছে। এই তহবিল মূলত জোটের নতুন 'অ্যালাইড রিঅ্যাকশন ফোর্স' (ARF)-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সাইবার-মহাকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে ব্যয় হবে। ইতিমধ্যে মধ্য ইউরোপ জুড়ে ন্যাটোর নতুন 'স্টেডফাস্ট ডার্ট' (Steadfast Dart) সামরিক মহড়া শুরু হয়েছে, যা নতুন প্রতিরক্ষানীতির প্রথম বড় অগ্নিপরীক্ষা। ইউক্রেনকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও প্রশিক্ষণ সহায়তা বজায় রাখাও এই বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার।
বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর এই নতুন কৌশল ইউরোপের দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের সামরিক নির্ভরতা থেকে বের হয়ে স্বনির্ভর হতে বাধ্য করবে, যা সমগ্র পশ্চিমা ব্লকের প্রতিরক্ষা সমীকরণকে বদলে দেবে।




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।