ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ, নেই মুজিবের ঐতিহাসিক ছবি

সংস্কারের পর পুনরায় খোলা ডাকসু সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হলেও শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষা আন্দোলন থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত রাজনৈতিক ভূমিকার উল্লেখযোগ্য আলোকচিত্র দেখা যায়নি। প্রদর্শনী নির্বাচনের নীতিমালা ও পুরোনো ছবিগুলোর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পূর্ণ সংবাদ প্রতিবেদন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংস্কার করা সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পেয়েছে। বিপরীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ৭ মার্চের ভাষণের মতো ঐতিহাসিক পর্বের কোনো স্বতন্ত্র আলোকচিত্র নতুন প্রদর্শনীতে দেখা যায়নি।
রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংগ্রহশালাটির সংস্কারকাজ শেষে উদ্বোধন করা হয়। ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা সংস্কারকাজের তত্ত্বাবধান করেন। অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহসভাপতি সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস জানিয়েছে, সংগ্রহশালাটিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাসের আর্কাইভ হিসেবে সাজানোর কথা বলেছেন ডাকসু নেতারা।
সংগ্রহশালা ঘুরে করা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিন্নাহর তিনটি উপস্থাপনার মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ভাষণের ছবি। সেখানে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন—যা পূর্ব বাংলায় ভাষাভিত্তিক প্রতিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়টি ১৯৪০ সালের লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত জিন্নাহর ছবি-সংবলিত একটি সংবাদ কাটিং।
মুজিবের যেসব অধ্যায় নেই
নতুন বিন্যাসে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক প্রতিকৃতি দেখা যায়নি বলে ঘটনাস্থলভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের ভাষণ—তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এসব নির্ধারক অধ্যায়ের ছবিও অনুপস্থিত।
তবে মুজিব সম্পূর্ণভাবে প্রদর্শনীর বাইরে নন। ১৯৭৪ সালে তাঁর দুই ছেলের বিয়ের একটি আলোকচিত্র, তাঁর ছবি-সংবলিত তিনটি সংবাদপত্রের কাটিং এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটি খোদাইচিত্রে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। একই অংশে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও ‘বাংলাদেশে কোনো বিরোধীদল নেই’ শিরোনামের একটি পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদনও রাখা হয়েছে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের অংশে মুজিবের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ছবি না রাখার কারণ জানতে চাইলে ফাতিমা তাসনিম জুমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।” জিন্নাহর ছবি প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তি হিসেবে জিন্নাহকে নয়, সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংগ্রহশালা থেকে তাঁর ভাষায় “ফ্যাসিবাদের সব আইকনের” ছবি সরানো হয়েছিল। তবে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের অংশে মুজিবের উপস্থিতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুরোনো ছবির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
সংগ্রহশালার সাবেক দায়িত্বশীল কর্মী গোপাল চন্দ্র দাসের দাবি, তাঁর দায়িত্বকালে সেখানে জিন্নাহর ছবি ছিল না এবং মুজিবের বেশ কিছু দুর্লভ ছবি আগে সংরক্ষিত ছিল। ১৯৯১ সাল থেকে ডাকসুতে কর্মরত এই সাবেক কর্মী সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার সময় ঐতিহাসিক উপকরণ সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন।
২০২৩ সালে প্রকাশিত দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের একটি সচিত্র প্রতিবেদনে সংগ্রহশালার ভেতরে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনটি অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের ৭ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, সংবাদপত্র, পোস্টার এবং বিভিন্ন সময়ের ছাত্রনেতাদের স্মারক সংরক্ষিত ছিল।
বর্তমান ডাকসু সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ জানিয়েছেন, প্রদর্শনীতে এখনও কিছু ছবি ও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ভুল সংশোধন ও নতুন উপকরণ যুক্ত করার জন্য উদ্বোধনের পরের এক সপ্তাহকে সংশোধনের সময় হিসেবে রাখা হয়েছে। ডাকসু নেতা সাদিক কায়েমও গবেষক ও নাগরিকদের কাছে থাকা ঐতিহাসিক দলিল সংগ্রহশালায় জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে কোন নীতিমালা বা বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শে প্রদর্শনীর ছবি নির্বাচন করা হয়েছে, আগের নিদর্শনগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা কোথায় এবং সরিয়ে নেওয়া ছবিগুলো সংরক্ষিত আছে কি না—এসব প্রশ্নের বিস্তারিত প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
আমরা যা জানি
সংগ্রহশালাটি ১৩ সেপ্টেম্বর সংস্কারের পর উদ্বোধন করা হয়েছে।
বর্তমান বিন্যাসে জিন্নাহর ছবি-সংবলিত তিনটি প্রদর্শনী রয়েছে।
মুজিবের একক প্রতিকৃতি এবং ১৯৪৭–৭১ সময়ের প্রধান রাজনৈতিক অধ্যায়ের স্বতন্ত্র ছবি দেখা যায়নি।
কয়েকটি সংবাদ কাটিং, পারিবারিক ছবি ও একটি খোদাইচিত্রে মুজিবের উপস্থিতি রয়েছে।
ডাকসু কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহ ধরে সংশোধন ও নতুন উপকরণ সংযোজনের কথা জানিয়েছে।
যা এখনও স্পষ্ট নয়
ছবিগুলো নির্বাচনের কোনো লিখিত ও প্রকাশ্য নীতিমালা আছে কি না।
আগে থাকা মুজিবের ছবিগুলো কোথায় রাখা হয়েছে এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কী।
জিন্নাহর প্রদর্শনীগুলো সংস্কারের সময়ই প্রথম যুক্ত হয়েছে কি না।
চূড়ান্ত বিন্যাস অনুমোদনে ইতিহাসবিদ, আর্কাইভ বিশেষজ্ঞ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কমিটি যুক্ত ছিল কি না।
সূত্র ও যাচাই নোট
তথ্য ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ১০টা UTC পর্যন্ত হালনাগাদ। উদ্বোধন ও ডাকসু নেতাদের বক্তব্য একাধিক প্রতিবেদনে মিললেও প্রদর্শনীর পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা পাওয়া যায়নি; ছবি সংযোজন ও অপসারণের দাবি প্রধানত ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী সংবাদমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যনির্ভর।
১৯. সরাসরি সূত্র
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম—ডাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কারে ঠাঁই পেলেন জিন্নাহ
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস—আধুনিক ও নান্দনিক রূপ পেল ডাকসু সংগ্রহশালা
ভিউজ বাংলাদেশ—ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ, নেই বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল কোনো ছবি
#ডাকসু #ঢাকা_বিশ্ববিদ্যালয় #ডাকসু_সংগ্রহশালা #বাংলাদেশের_ইতিহাস #ভাষা_আন্দোলন #মুক্তিযুদ্ধ #DUCSU #DhakaUniversity




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।